ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা আলোচনা কর মাধ্যমিক ইতিহাস 8 marks
Q)সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো:-
(প্রশ্ন মান–৮, মাধ্যমিক ২০১৭)
FIROZ SIR
Ans) বিংশ শতকে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে ব্রিটিশ শাসনকে বিকল করার লক্ষ্যে বাংলার নারী সমাজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে।
১. পরোক্ষভাবে বিপ্লবী কাজকর্মে নারী:-
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার নারীসমাজ প্রথমদিকে পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল। বাংলার নারী সমাজ বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়ে, অস্ত্র সরবরাহ করে, গোপন স্থানে সংবাদ পৌঁছে দিয়ে, পুলিশকে বিভ্রান্ত করে, বিপ্লবীদের পালাতে সাহায্য করে পরোক্ষভাবে বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আবার বহু নারী নিজেদের টাকা-পয়সা, সোনার গহনা দিয়েও পরোক্ষভাবে বৈপ্লবিক আন্দোলনে সহায়তা করেন।
২. প্রত্যক্ষভাবে নারীদের অংশগ্রহণ:-
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে সশস্ত্র বিপ্লবে বাঙালি নারীরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে বিদেশি দ্রব্য বর্জন, পিকেটিং, অনশন, আইন-অমান্য ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করতেন। ব্রিটিশ সরকার পুলিশি অত্যাচার, গ্রেপ্তার, নির্বাসন প্রভৃতি নির্যাতন চালালেও নারীদের আন্দোলন থেমে থাকে নি।
৩. সংগঠনের সঙ্গে নারীদের সংযোগ:-
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই বৈপ্লবিক কাজকর্মে নারীদের অংশগ্রহণ শুরু হয়। এজন্য তাঁরা গড়ে তোলেন বিভিন্ন সংগঠন। নারীদের বৈপ্লবিক কাজে উদ্বুদ্ধ করা ছিল এর উদ্দেশ্য। এই সংগঠনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে লীলা নাগ (রায়) প্রতিষ্ঠিত ‘দীপালি সংঘ’।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘দীপালি ছাত্রী সংঘ’।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে মাসিক পত্রিকা ‘জয়শ্রী’-তে দীপালি সংঘের আদর্শ এবং কার্যাবলি নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হত।
৪. বিশিষ্ট নারী: বিশ শতকে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে চিরস্মরণীয় নারীরা হলেন— প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীণা দাস, শান্তি ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী, কল্পনা দত্ত, ননীবালা দেবী, উজ্জ্বলা মজুমদার প্রমুখ।
৫. চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন:- মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের (১৮ এপ্রিল, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ) ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তিনি টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন অফিস ধ্বংস, পুলিশ লাইন দখল, জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ (১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ) ইত্যাদিতে অংশ নেন।
৬. ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ:- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলির ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করেন। এতে একজন ইউরোপীয় উচ্চপদস্থ অফিসার নিহত এবং কয়েকজন আহত হন। শেষপর্যন্ত বাড়ি ফিরে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রীতিলতা ওই দিনই পটাশিয়াম সায়ানাইড (KCN) খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
৭. কল্পনা দত্তের কার্যকলাপ:- চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের সঙ্গী ছিলেন কল্পনা দত্ত (১৯১৩–১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি সূর্য সেন প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’-র চট্টগ্রাম শাখায় ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে যোগদান করেন। কল্পনা দত্ত কলকাতা থেকে গোপনে বিস্ফোরক এনে তা দিয়ে ‘গান-কটন’ তৈরি করেন এবং এর সাহায্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জেলবন্দি বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, লোকনাথ বল প্রমুখকে পালাতে সাহায্য করেন। বিপ্লবী সূর্য সেন প্রীতিলতার সঙ্গে কল্পনাকেও চট্টগ্রামে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেন। কিন্তু আক্রমণের এক সপ্তাহ আগে তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলবন্দি হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কল্পনা দত্তকে ‘বাংলার অগ্নিকন্যা’ বলেছেন।
৮. বীণা দাসের কার্যকলাপ :-
কলকাতার ছাত্রী সংঘের সদস্যা বীণা দাস ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন। বিচার শেষে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড হয়।
৯. শান্তি ও সুনীতির কার্যকলাপ:-
কুমিল্লার দুই স্কুলছাত্রী সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি দাস ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর কুমিল্লার অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করেন। আবার ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে উজ্জ্বলা মজুমদার দার্জিলিং-এর লেবং-এ বাংলার গভর্নর অ্যান্ডারসনকে হত্যার চেষ্টা করলে ধরা পড়েন ও জেলবন্দি হন।
১০. ঝাঁসি ব্রিগেডের বীরত্ব:-
আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী বাহিনীর নাম ‘ঝাঁসি ব্রিগেড’। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ডা. লক্ষ্মী স্বামীনাথন (বিয়ের পর লক্ষ্মী সায়গল)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ) ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী নামে তিনি বার্মার জেলে বন্দি হন। ঝাঁসি ব্রিগেডের এক নারী সৈনিক বলেছিলেন—
“মরার জন্য আমরা সবাই প্রস্তুত। মৃত্যুকে ভয় পায় এমন একজনও মহিলা এই ফৌজে নেই।”
১১. সীমাবদ্ধতা
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের কিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়—
(i) সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার নারীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিলেও ভারতের অন্যান্য স্থানের নারীদের মধ্যে সেই ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় না।
(ii) সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সিংহভাগ নারী উন্নত পেশার সঙ্গে যুক্ত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবার থেকেই উঠে আসতেন। সমাজের নিম্নস্তরের নারীদের মধ্যে এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি।
•সীমাবদ্ধতা:- সত্ত্বেও বলা যায়, সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের লক্ষ্য ছিল এদেশে ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে দুর্বল করে যেকোনো মূল্যে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। শত অত্যাচার, লাঞ্ছনা সহ্য করেও তাঁরা তাঁদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
Comments
Post a Comment